Showing all posts by arbu
হাওরের কান্না থামবে কি শুধু বাঁধে!

আজাদুর রহমান চন্দন

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলার বড় অংশই হাওর। আর ওসব হাওরে বছরে একটিই মাত্র ফসল হয়, বোরো ধান। কিন্তু গত দুই দশকে গড়ে প্রতি তিন বছরেও একবার পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি 4 হাওরের কৃষকরা। টানা কয়েক বছর ফসল মার যাওয়ার পর ২০০৮ সালে হাওরে বোরো ধান কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। এর পরের ৯ বছরের মধ্যে মাত্র দুইবার পুরো ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হয় হাওরের কৃষক। অসময়ে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে এ বছর ধানগাছে থোড় আসতে না আসতেই কোথাও বাঁধ ভেঙে, কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে প্রায় সব হাওর। আগের বছর হাওরে বাঁধ ভেঙে কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখের শুরুতে। সে বছর ৪০ শতাংশের মতো ফসল তুলতে পেরেছিল হাওরের কৃষকরা। ২০১৫ সালে অকালবন্যায় হাওরে ফসল নষ্ট হয়েছিল শতকরা ৪০ ভাগের মতো।

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এ সাত জেলার ৪৮টি উপজেলার ২০ হাজার ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে দুই হাজার ৪১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে হাওরাঞ্চল। বছরের অর্ধেক সময় হাওরগুলো বহমান পানিতে ডুবে থাকায় জমিতে পলি জমে তা হয়ে ওঠে উর্বর। শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করাসহ পরিকল্পিত উপায়ে চাষ করতে পারলে এবং চৈত্র-বৈশাখে আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা গেলে এ অঞ্চল থেকে শুধু বোরো থেকেই যে পরিমাণ চাল উত্পাদন করা সম্ভব, তা দিয়ে গোটা দেশের খাদ্য চাহিদার বেশির ভাগ পূরণ করা যেতে পারে।

যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে পর্যটন এলাকা হিসেবেও এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। এককালে এই অঞ্চলের হাওর ও নদী থেকে তোলা উত্কৃষ্ট মুক্তা রপ্তানি হতো সুদূর ইউরোপে। মত্স্যসম্পদেরও বিশাল আধার হাওর। হাওরের মিঠা পানির মাছের মতো এমন সুস্বাদু মাছ অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন।

এবার কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত হাওরের উঠতি বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার পানি দূষিত হয়ে মারা গেছে মাছ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। হাওরে মাছ মরে ভেসে ওঠার ছবি কয়েক দিন ধরে ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে।  

এ বছর হাওর এলাকায় নদীতে পানির চাপ প্রথম দফায় বাড়ে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে; যদিও সেই পানির চাপ হাওরের বাঁধ ভাঙার মতো ছিল না, তবু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলতিতে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল প্রকল্পের ফসল রক্ষা বাঁধের একটি ভাঙা অংশ সময়মতো মেরামত না করায় ওই প্রকল্পের আওতাধীন ১০টির মতো হাওরের উঠতি বোরো ধান তলিয়ে যায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ১২ ফাল্গুন থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে। এরপর ২৯ মার্চ থেকে সিলেট অঞ্চলে শুরু হয় টানা বর্ষণ। প্রবল বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যায় হাওর এলাকার নদ-নদীর। ওই পানির চাপে কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে গত ৪ এপ্রিল থেকে ফসল তলিয়ে যেতে থাকে একের পর এক হাওরের।

ধান, মাছ, পাখি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাময় হাওরাঞ্চলের দিকে এতকাল সামান্যই নজর পড়েছে জাতীয় নীতিনির্ধারকদের। নজর যেটুকু পড়েছে তা শুধু হাওরে বেড়িবাঁধ ও ডুবোসড়ক নির্মাণের দিকেই। প্রতিবছর কয়েক শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় হাওরে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য; কিন্তু তাতে কাজের কাজ তেমন হয় না।

একটা সময় পর্যন্ত নদী খননের কথা উঠলেই জাতীয় নীতিনির্ধারকরা ব্যয়বহুল আখ্যা দিয়ে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতেন। অথচ এটা না করায় খননজনিত খরচের চেয়ে কত বেশি লোকসান বা ক্ষতি হচ্ছে সে হিসাব খতিয়ে দেখা হয়নি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোও নদী খননের মতো প্রকল্প হাতে নিতে নিরুৎসাহ করত। এ ধরনের কাজে এখনো তেমন উৎসাহ তাদের দেখা যায় না। তবে দিন বদলেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে এখন নদী খননের নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। বাইরে থেকে এ খাতে অর্থও মিলছে। এখন উপকূল অঞ্চলের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলেও যে নদী খননের ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে নীতিনির্ধারকদের সামনে। তা না হলে বিপদ আরো বাড়বে।

বেশ কয়েক বছর আগেই ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডাব্লিউএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের হাওরগুলোর পানির উচ্চতা প্রাক-বর্ষা মৌসুমে ০.৩ থেকে ০.৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জের কর্চার হাওরের পানির উচ্চতা ০.৩ মিটার এবং সিলেটের জিলকর ও মৌলভীবাজারের কাওয়ারদীঘি হাওরের পানির উচ্চতা ০.৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। তেমনটি হলে কৃষকরা সময়মতো চাষ শুরু করলেও ফসল তোলা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

বৈশাখে আগাম বন্যায় হাওরের ফসল তলিয়ে গেলেও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে সেখানে সেচ দেওয়ার মতো পানি থাকে না নদ-নদীতে। অথচ কয়েক দশক আগেও ওই অঞ্চলের কোনো কোনো নদী দিয়ে সারা বছর বড় ডাবল ডেকার লঞ্চ, কার্গো, স্টিমার চলাচল করত। আর তখন হাওর রক্ষায় কোনো বেড়িবাঁধও ছিল না। হাওরের পানি নিষ্কাশনের খালগুলোতে শুধু পানি আসার আগে বাঁধ দেওয়া হতো। সেটাও দিত এলাকার কৃষকরা নিজ উদ্যোগেই। তাতেই রক্ষা পেত হাওরের ফসল। এমনকি কোনো কোনো বছর ফসল কাটার পর জমিতে থাকা গোড়া বা নাড়া থেকে নতুন করে কুশি গজাত এবং তা থেকে মিলত মুরি ফসল। এলাকার অসচ্ছল লোকজন সংগ্রহ করত সেই মুরি ফসল, যাকে নেত্রকোনা-সুনামগঞ্জের হাওরের মানুষ বলত ‘ডেমি’। অথচ এখন বাঁধ দিয়েও মূল ফসলই তোলা যাচ্ছে না।

জলবায়ু যেভাবে বদলে যাচ্ছে তাতে শুধু হাওরে বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না—সে সত্যটি দিন দিনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ বছর হাওরে যে দুর্যোগ দেখা দিয়েছে তা মোকাবেলা করার জন্য আশু ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি যেমন হাতে নেওয়া দরকার, তেমনি হাওরের কৃষকের কান্না স্থায়ীভাবে থামাতে হলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও হাওরাঞ্চলের নদীগুলো খনন করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। বাঁধের ভেতরে থাকা মরা নদী, খাল-বিলও খনন করা দরকার। আশার কথা, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষায় সব নদী খনন ও প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তবে সব কাজের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে স্থানীয়ভাবেও। যেমন বাঁধের ভেতরের মরা নদী ও খাল-বিল খনন এবং বাঁধের দুই পাশে জলজ বৃক্ষরোপণের মতো কাজগুলো স্থানীয় সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নিয়ে, এমনকি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেও করতে পারে। সব কিছুর আগে দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা ও গণজাগরণ।

যারাই ঘটিয়েই থাকুক ঘটনাটি শোকের উদ্বেগের

আজাদুর রহমান চন্দন

আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে লেখক, ব্লগার, পুরোহিত, সেবায়েতসহ এ ধরনের বেশ কিছু লোককে হত্যা করা হয়েছে অনেকটা একই কায়দায়। এসব হত্যাকাণ্ডকে কেউ বলছে গুপ্ত হত্যা, কেউ বলছে টার্গেটেড কিলিং। mournবেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের নামে হত্যার দায় স্বীকার করে বার্তা প্রচার করেছে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। আর ওই দাবি যে সঠিক তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মরীয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। গতরাতে রাজধানীর গুলশানে একটি রেস্তোরাঁয় বিদেশিহ বেশ কিছু লোককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তার দায়ও যথারীতি স্বীকার করা হয়েছে আইএসের নামে সেই সাইটেরই টুইট বার্তায়। এ নিয়ে উচ্ছাস লুকাতে পারছে না দেশের সরকারবিদ্বেষী কিছু লোক। তারা জোর গলায় বলছে, সরকার এতদিন দেশে আইএসের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসলেও এবার আর তা পারবে না! এ কথা তারা এমনভাবে বলছে যেন দেশে আইএসের অস্তিত্ব প্রমাণ হলে তাতে তাদের খুবই লাভ! Continue Reading →

দূষণে বাড়ছে বজ্রপাত, বাড়ছে প্রাণহানি

আজাদুর রহমান চন্দন

এখন থেকে ১৫-২০ বছর আগেও বজ্রপাত মানুষের কাছে তেমন আতঙ্কের বিষয় ছিল না। আমাদের দেশে কয়েক থানা এলাকা ঘুরে হয়তোবা বজ্রপাতে ওপরের অংশ পুড়ে যাওয়া দু-একটি নারিকেল বা তালগাছের দেখা lightingপাওয়া যেত। কিন্তু গত সাত-আট বছর ধরে ঝড়ের মৌসুমে বাজ পড়ে মানুষের প্রাণহানিটা যেন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দেশে বজ্রপাত এবং এর দরুন প্রাণহানি ও ক্ষয়তির মাত্রা দিন দিনই বাড়ছে। কিন্তু এতদিন এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথাও লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না। সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান বজ্রপাতের পূর্বাভাস দেওয়া এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত প্রাণহানির সংবাদ সংগ্রহ করার মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব সারছিল। বজ্রপাত বাড়ার কারণ জানা বা প্রতিরোধের উপায় বের করার বিষয়ে কোনো গবেষণা তো নেই-ই কোনো সরকারি প্রতিষ্ঠানের, এমনকি বজ্রপাতে প্রাণহানি বা ক্ষয়ক্ষতি কমানোর উপায় নিয়ে চিন্তাও ছিল এতদিন অনুপস্থিত। ২০০৮ সাল থেকে পর পর কয়েক বছর বজ্রপাত নিয়ে লিখেছি জাতীয় দৈনিকে। প্রতিবারই লেখার আগে কথা বলেছি আবহাওয়া অধিদপ্তর, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরো (বর্তমানে অধিদপ্তর), বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা ও দূর অনুধাবন প্রতিষ্ঠান (স্পারসো), সার্ক আবহাওয়া গবেষণা কেন্দ্রের (এসএমআরসি) কর্মকর্তাদের সঙ্গে। সবাই একই কথা জানিয়েছেন, বজ্রপাত নিয়ে কোনো গবেষণা নেই তাদের। এমনকি বজ্রপাতকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে মানতেও রাজি হননি তখনকার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর কর্মকর্তারা। ব্যুরোর তখনকার কমিউনিকেশনস ও মিডিয়া স্পেশালিস্ট সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, বজ্রপাত কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়। এটি দুর্যোগের সাইড ইফেক্ট (পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া) মাত্র। এ অবস্থায় ২০১২ সালে একটি লেখার শিরোনামই দিয়েছিলাম ‘আর কত প্রাণ গেলে তারে দুর্যোগ বলা যায়’ (https://chandan64kalantor.wordpress.com/2012/08/11/)। Continue Reading →

যুদ্ধাপরাধীর তালিকা সন্ধান

আজাদুর রহমান চন্দন

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা আর ধ্বংসের যে তাণ্ডবলীলা শুরু করেছিল হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী, দ্রুতই তারা এর বিস্তার ঘটিয়েছিল সারাদেশে। সেই রাতের Yahyaসামরিক অভিযানের ভয়াবহতা প্রকাশ করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানেরই এক সেনা কর্মকর্তা তার বইয়ে লিখেছেন, ‘নির্ধারিত সময়ের আগেই অ্যাকশন শুরু হয়ে গিয়েছিল।… খুলে গিয়েছিল নরকের সবকটি দরজা।’ এভাবেই হানাদাররা পরবর্তী ৯ মাসে গোটা বাংলাদেশকেই এক বিশাল নরকে পরিণত করেছিল, যা দেখে মার্কিন সাংবাদিক সিডিনি এইচ শনবার্গ নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছিলেন ‘‘বেঙ্গলি’স ল্যান্ড অ্যা ভাস্ট সিমেটারি’’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি সিকান্দর আবু জাফরের লেখা এক বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল পূর্বদেশ পত্রিকায়, যার শিরোনাম ছিল ‘গ্রামে গ্রামে বধ্যভূমি তার নাম আজ বাংলাদেশ’। আর গোটা বাংলাদেশকে বধ্যভূমি বানানোর সেই দুষ্কর্মে সক্রিয় সহযোগিতা করেছিল হানাদারদের স্থানীয় কিছু দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে নানা সংগঠন ও বাহিনী গড়ে। এদের মধ্যে আলবদর নামের জল­াদ বাহিনীটি হয়ে উঠেছিল হানাদার বাহিনীর ‘ডেথ স্কোয়াড’। নানা ত্রুটি-দুর্বলতা সত্ত্বেও শত বাধা-ষড়যন্ত্র পেরিয়ে আজ যখন বাংলাদেশ হানাদার-সহযোগী সেই জল্লাদদের বিচার করার মাধ্যমে সাড়ে চার দশকের পুরনো গ্লানি মোচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একাত্তরের পরাজিত ও হাল আমলের ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তান তার পুরনো দোসরদের পক্ষ নিয়ে কূটনৈতিক রীতিনীতি উপক্ষা করে এমন বাড়াবাড়ি শুরু করল যে দীর্ঘদিন পর খোদ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী-গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবিটিও সামনে চলে এলো। এ অবস্থায় জোরেশোরেই শুরু হলো স্বাধীনতার পর বিচারের জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা খোঁজাখুঁজি। কিন্তু বহুল আলোচিত সেই ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর তালিকা পাওয়া গেল না কোথাও। না পাওয়ারই কথা! তবে ২০০ জনের একটি তালিকা এরই মধ্যে হাজির করা হলো একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এক সংগঠনের পক্ষ থেকে। প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে ওই তালিকা তুলে ধরা হলেও জানানো হয়নি তালিকাটি কোথা থেকে পাওয়া গেল। Continue Reading →

স্বীকৃতি

আজাদুর রহমান চন্দন

একাত্তরে আলবদর বাহিনীর প্রধান ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। মুক্তিযুদ্ধে নিজেদের পরাজয় যখন অবশ্যম্ভাবী হয়ে উঠে, তখন নিজামীর নেতৃত্বাধীন ওই জল্লাদ বাহিনীই পাকিস্তানি সেনাদের সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ killers & collaboratorsসন্তান বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পিতভাবে ধরে নিয়ে টর্চার সেলে নির্যাতনের পর বধ্যভূমিতে নিয়ে হত্যা করে নিষ্ঠুরতম কায়দায়। নিজামীর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের (রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী দল) উত্থাপন করা ফরমাল চার্জে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিবরণ থাকলেও সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আকারে ছিল না। পরে অভিযোগ গঠনকালে ট্রাইব্যুনাল নিজ ক্ষমতাবলে নিজামীর বিরুদ্ধে ১৬ নং অভিযোগ হিসেবে এটি অন্তর্ভুক্ত করেন। এতে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে নিজামীর ‘সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি’ তুলে ধরা হয়। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া ফাঁসির দণ্ড বহাল আছে আপিলের রায়েও।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে নিজামীর বিরুদ্ধে এই অপরাধের প্রমাণ হিসেবে রাষ্ট্রপক্ষের পেশ করা যেসব সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে তার মধ্যে আমার লেখা ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা’ বইটিও আছে। Continue Reading →

একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা
যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যা ১৯৭১ (দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০১১)
অত্যাচারী বাপ-বেটার দর্প চূর্ণ একই কারাগারে

আজাদুর রহমান চন্দন

ফ. কা. চৌধুরী নামে পরিচিত চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সভাপতি। ষাটের দশকে পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের Dainik Pakistan 21-4-1971স্পিকারও হন ফ.কা.। সারা পাকিস্তানেই তিনি ছিলেন প্রচণ্ড প্রতাপশালী। ফ.কা. চৌধুরী এতটাই প্রভাবশালী ও দাম্ভিক ছিলেন যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করার পর মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপিসহ দালাল দলগুলোর অন্য নেতারা দল বেঁধে গভর্নর টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও ফ.কা. তার সঙ্গে দেখা করেছেন শুধু নিজ দলের জেনারেল সেক্রেটারি মালিক মোহাম্মদ কাসিমকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তি কমিটিরও আলাদা একটি ধারা ছিল ফ.কা.র নেতৃত্বে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর তার প্রভাব ছিল যেমন অসীম, তেমনি চট্টগ্রামে মুক্তিকামী মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর তার নির্যাতনও ছিল অসহনীয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর থেকে আত্মসমর্পণের কয়েক দিন আগ পর্যন্ত তার বাসায় সব সময় মোতায়েন থাকত পাকিস্তান বাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য। ফ.কা.র অনুচরেরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনত নিরপরাধ লোকজন আর ছাত্রদের। এরপর এদের হাত-পা বেঁধে গিরায় গিরায় লোহার ডাণ্ডা দিয়ে পেটানো হতো। তার বাসায় নির্মম অত্যাচারের এতসব কায়দা ও ব্যবস্থা ছিল যে নীরোর যুগে জন্মালে তিনি নিশ্চয়ই প্রভোস্ট মার্শালের পদ পেতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফজলুল কাদের চৌধুরী ২৫ শে মার্চের পর থেকে চাটগাঁয় অত্যাচারের যে স্টিমরোলার চালিয়েছিলেন, আইকম্যান বেঁচে থাকলে এই অত্যাচার দেখে তাঁকে নিশ্চয়ই স্যালুট দিতেন।’ সংগত কারণেই হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর পর দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী এই জুলুমবাজ। Continue Reading →

ফাঁসিতে ঝুলতেই হলো ঘাতক সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদকে

আজাদুর রহমান চন্দন

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি অবশেষে কার্যকর করা হয়েছে। আদালতের রায় SaKa cartoon copyঅনুযায়ী আজ শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে শীর্ষস্থানীয় এই দুই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে আইজি প্রিজন্স জানান। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথম কোনো মন্ত্রীর ফাঁসি কার্যকর হলো। দুই অপরাধীই ভিন্ন ভিন্ন সরকারের সময় মন্ত্রী ছিলেন। দুজনের মধ্যে একাত্তরের কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদের প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে এটিই প্রথম ফাঁসি। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এ নিয়ে চারজনের ফাঁসি কার্যকর হলো। ফাঁসি কার্যকর শেষে র‌্যাব ও পুলিশ প্রহরায় সাকা চৌধুরীর লাশ চট্টগ্রামে এবং মুজাহিদের লাশ ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিচার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দম্ভোক্তি প্রকাশকারী দুই মানবতাবিরোধী অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করার আগে কারাগার এলাকায় জড়ো হন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মী। তাঁরা সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে স্লোগানও দেন। Continue Reading →

বিপন্ন পৃথিবী : জল জলবায়ু ও জীবন (Endangered Earth)

biponno prithibi -2 

 

 

 

 

 

 

 

 

Biponno Prithibi

Next Page