Category Archives: জাতীয়
হাওরের কান্না থামবে কি শুধু বাঁধে!

আজাদুর রহমান চন্দন

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলার বড় অংশই হাওর। আর ওসব হাওরে বছরে একটিই মাত্র ফসল হয়, বোরো ধান। কিন্তু গত দুই দশকে গড়ে প্রতি তিন বছরেও একবার পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি 4 হাওরের কৃষকরা। টানা কয়েক বছর ফসল মার যাওয়ার পর ২০০৮ সালে হাওরে বোরো ধান কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। এর পরের ৯ বছরের মধ্যে মাত্র দুইবার পুরো ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হয় হাওরের কৃষক। অসময়ে কয়েক দিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে এ বছর ধানগাছে থোড় আসতে না আসতেই কোথাও বাঁধ ভেঙে, কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে প্রায় সব হাওর। আগের বছর হাওরে বাঁধ ভেঙে কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখের শুরুতে। সে বছর ৪০ শতাংশের মতো ফসল তুলতে পেরেছিল হাওরের কৃষকরা। ২০১৫ সালে অকালবন্যায় হাওরে ফসল নষ্ট হয়েছিল শতকরা ৪০ ভাগের মতো।

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া—এ সাত জেলার ৪৮টি উপজেলার ২০ হাজার ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে দুই হাজার ৪১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে হাওরাঞ্চল। বছরের অর্ধেক সময় হাওরগুলো বহমান পানিতে ডুবে থাকায় জমিতে পলি জমে তা হয়ে ওঠে উর্বর। শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করাসহ পরিকল্পিত উপায়ে চাষ করতে পারলে এবং চৈত্র-বৈশাখে আগাম বন্যার হাত থেকে রক্ষা করা গেলে এ অঞ্চল থেকে শুধু বোরো থেকেই যে পরিমাণ চাল উত্পাদন করা সম্ভব, তা দিয়ে গোটা দেশের খাদ্য চাহিদার বেশির ভাগ পূরণ করা যেতে পারে।

যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে পর্যটন এলাকা হিসেবেও এই অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। এককালে এই অঞ্চলের হাওর ও নদী থেকে তোলা উত্কৃষ্ট মুক্তা রপ্তানি হতো সুদূর ইউরোপে। মত্স্যসম্পদেরও বিশাল আধার হাওর। হাওরের মিঠা পানির মাছের মতো এমন সুস্বাদু মাছ অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন।

এবার কয়েক দিনের ব্যবধানে শত শত হাওরের উঠতি বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার পানি দূষিত হয়ে মারা গেছে মাছ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। হাওরে মাছ মরে ভেসে ওঠার ছবি কয়েক দিন ধরে ছাপা হচ্ছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে।  

এ বছর হাওর এলাকায় নদীতে পানির চাপ প্রথম দফায় বাড়ে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে; যদিও সেই পানির চাপ হাওরের বাঁধ ভাঙার মতো ছিল না, তবু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলতিতে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল প্রকল্পের ফসল রক্ষা বাঁধের একটি ভাঙা অংশ সময়মতো মেরামত না করায় ওই প্রকল্পের আওতাধীন ১০টির মতো হাওরের উঠতি বোরো ধান তলিয়ে যায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ১২ ফাল্গুন থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে। এরপর ২৯ মার্চ থেকে সিলেট অঞ্চলে শুরু হয় টানা বর্ষণ। প্রবল বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যায় হাওর এলাকার নদ-নদীর। ওই পানির চাপে কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে গত ৪ এপ্রিল থেকে ফসল তলিয়ে যেতে থাকে একের পর এক হাওরের।

ধান, মাছ, পাখি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাময় হাওরাঞ্চলের দিকে এতকাল সামান্যই নজর পড়েছে জাতীয় নীতিনির্ধারকদের। নজর যেটুকু পড়েছে তা শুধু হাওরে বেড়িবাঁধ ও ডুবোসড়ক নির্মাণের দিকেই। প্রতিবছর কয়েক শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় হাওরে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য; কিন্তু তাতে কাজের কাজ তেমন হয় না।

একটা সময় পর্যন্ত নদী খননের কথা উঠলেই জাতীয় নীতিনির্ধারকরা ব্যয়বহুল আখ্যা দিয়ে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতেন। অথচ এটা না করায় খননজনিত খরচের চেয়ে কত বেশি লোকসান বা ক্ষতি হচ্ছে সে হিসাব খতিয়ে দেখা হয়নি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোও নদী খননের মতো প্রকল্প হাতে নিতে নিরুৎসাহ করত। এ ধরনের কাজে এখনো তেমন উৎসাহ তাদের দেখা যায় না। তবে দিন বদলেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে এখন নদী খননের নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। বাইরে থেকে এ খাতে অর্থও মিলছে। এখন উপকূল অঞ্চলের পাশাপাশি হাওরাঞ্চলেও যে নদী খননের ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে নীতিনির্ধারকদের সামনে। তা না হলে বিপদ আরো বাড়বে।

বেশ কয়েক বছর আগেই ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডাব্লিউএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের হাওরগুলোর পানির উচ্চতা প্রাক-বর্ষা মৌসুমে ০.৩ থেকে ০.৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে সুনামগঞ্জের কর্চার হাওরের পানির উচ্চতা ০.৩ মিটার এবং সিলেটের জিলকর ও মৌলভীবাজারের কাওয়ারদীঘি হাওরের পানির উচ্চতা ০.৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। তেমনটি হলে কৃষকরা সময়মতো চাষ শুরু করলেও ফসল তোলা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।

বৈশাখে আগাম বন্যায় হাওরের ফসল তলিয়ে গেলেও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে সেখানে সেচ দেওয়ার মতো পানি থাকে না নদ-নদীতে। অথচ কয়েক দশক আগেও ওই অঞ্চলের কোনো কোনো নদী দিয়ে সারা বছর বড় ডাবল ডেকার লঞ্চ, কার্গো, স্টিমার চলাচল করত। আর তখন হাওর রক্ষায় কোনো বেড়িবাঁধও ছিল না। হাওরের পানি নিষ্কাশনের খালগুলোতে শুধু পানি আসার আগে বাঁধ দেওয়া হতো। সেটাও দিত এলাকার কৃষকরা নিজ উদ্যোগেই। তাতেই রক্ষা পেত হাওরের ফসল। এমনকি কোনো কোনো বছর ফসল কাটার পর জমিতে থাকা গোড়া বা নাড়া থেকে নতুন করে কুশি গজাত এবং তা থেকে মিলত মুরি ফসল। এলাকার অসচ্ছল লোকজন সংগ্রহ করত সেই মুরি ফসল, যাকে নেত্রকোনা-সুনামগঞ্জের হাওরের মানুষ বলত ‘ডেমি’। অথচ এখন বাঁধ দিয়েও মূল ফসলই তোলা যাচ্ছে না।

জলবায়ু যেভাবে বদলে যাচ্ছে তাতে শুধু হাওরে বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না—সে সত্যটি দিন দিনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ বছর হাওরে যে দুর্যোগ দেখা দিয়েছে তা মোকাবেলা করার জন্য আশু ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি যেমন হাতে নেওয়া দরকার, তেমনি হাওরের কৃষকের কান্না স্থায়ীভাবে থামাতে হলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও হাওরাঞ্চলের নদীগুলো খনন করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। বাঁধের ভেতরে থাকা মরা নদী, খাল-বিলও খনন করা দরকার। আশার কথা, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষায় সব নদী খনন ও প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তবে সব কাজের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে স্থানীয়ভাবেও। যেমন বাঁধের ভেতরের মরা নদী ও খাল-বিল খনন এবং বাঁধের দুই পাশে জলজ বৃক্ষরোপণের মতো কাজগুলো স্থানীয় সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নিয়ে, এমনকি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেও করতে পারে। সব কিছুর আগে দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা ও গণজাগরণ।

যারাই ঘটিয়েই থাকুক ঘটনাটি শোকের উদ্বেগের

আজাদুর রহমান চন্দন

আমাদের দেশে সাম্প্রতিক সময়ে লেখক, ব্লগার, পুরোহিত, সেবায়েতসহ এ ধরনের বেশ কিছু লোককে হত্যা করা হয়েছে অনেকটা একই কায়দায়। এসব হত্যাকাণ্ডকে কেউ বলছে গুপ্ত হত্যা, কেউ বলছে টার্গেটেড কিলিং। mournবেশিরভাগ ঘটনার ক্ষেত্রেই মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের নামে হত্যার দায় স্বীকার করে বার্তা প্রচার করেছে সাইট ইন্টেলিজেন্স গ্রুপ। আর ওই দাবি যে সঠিক তা প্রতিষ্ঠিত করার জন্য মরীয়া চেষ্টা চালিয়ে আসছিল যুক্তরাষ্ট্র। গতরাতে রাজধানীর গুলশানে একটি রেস্তোরাঁয় বিদেশিহ বেশ কিছু লোককে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে যে হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে, তার দায়ও যথারীতি স্বীকার করা হয়েছে আইএসের নামে সেই সাইটেরই টুইট বার্তায়। এ নিয়ে উচ্ছাস লুকাতে পারছে না দেশের সরকারবিদ্বেষী কিছু লোক। তারা জোর গলায় বলছে, সরকার এতদিন দেশে আইএসের অস্তিত্ব অস্বীকার করে আসলেও এবার আর তা পারবে না! এ কথা তারা এমনভাবে বলছে যেন দেশে আইএসের অস্তিত্ব প্রমাণ হলে তাতে তাদের খুবই লাভ! Continue Reading →

যুদ্ধাপরাধীর তালিকা সন্ধান

আজাদুর রহমান চন্দন

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ কালরাতে ঢাকায় ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা আর ধ্বংসের যে তাণ্ডবলীলা শুরু করেছিল হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনী, দ্রুতই তারা এর বিস্তার ঘটিয়েছিল সারাদেশে। সেই রাতের Yahyaসামরিক অভিযানের ভয়াবহতা প্রকাশ করতে গিয়ে পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানেরই এক সেনা কর্মকর্তা তার বইয়ে লিখেছেন, ‘নির্ধারিত সময়ের আগেই অ্যাকশন শুরু হয়ে গিয়েছিল।… খুলে গিয়েছিল নরকের সবকটি দরজা।’ এভাবেই হানাদাররা পরবর্তী ৯ মাসে গোটা বাংলাদেশকেই এক বিশাল নরকে পরিণত করেছিল, যা দেখে মার্কিন সাংবাদিক সিডিনি এইচ শনবার্গ নিউইয়র্ক টাইমসে লিখেছিলেন ‘‘বেঙ্গলি’স ল্যান্ড অ্যা ভাস্ট সিমেটারি’’। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ২০ জানুয়ারি সিকান্দর আবু জাফরের লেখা এক বিশেষ প্রতিবেদন ছাপা হয়েছিল পূর্বদেশ পত্রিকায়, যার শিরোনাম ছিল ‘গ্রামে গ্রামে বধ্যভূমি তার নাম আজ বাংলাদেশ’। আর গোটা বাংলাদেশকে বধ্যভূমি বানানোর সেই দুষ্কর্মে সক্রিয় সহযোগিতা করেছিল হানাদারদের স্থানীয় কিছু দোসর শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস নামে নানা সংগঠন ও বাহিনী গড়ে। এদের মধ্যে আলবদর নামের জল­াদ বাহিনীটি হয়ে উঠেছিল হানাদার বাহিনীর ‘ডেথ স্কোয়াড’। নানা ত্রুটি-দুর্বলতা সত্ত্বেও শত বাধা-ষড়যন্ত্র পেরিয়ে আজ যখন বাংলাদেশ হানাদার-সহযোগী সেই জল্লাদদের বিচার করার মাধ্যমে সাড়ে চার দশকের পুরনো গ্লানি মোচনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে, তখন একাত্তরের পরাজিত ও হাল আমলের ব্যর্থ রাষ্ট্র পাকিস্তান তার পুরনো দোসরদের পক্ষ নিয়ে কূটনৈতিক রীতিনীতি উপক্ষা করে এমন বাড়াবাড়ি শুরু করল যে দীর্ঘদিন পর খোদ পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধী-গণহত্যাকারীদের বিচারের দাবিটিও সামনে চলে এলো। এ অবস্থায় জোরেশোরেই শুরু হলো স্বাধীনতার পর বিচারের জন্য প্রস্তুত পাকিস্তানি যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা খোঁজাখুঁজি। কিন্তু বহুল আলোচিত সেই ১৯৫ পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীর তালিকা পাওয়া গেল না কোথাও। না পাওয়ারই কথা! তবে ২০০ জনের একটি তালিকা এরই মধ্যে হাজির করা হলো একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে গঠিত এক সংগঠনের পক্ষ থেকে। প্রকাশ্য সংবাদ সম্মেলনে ওই তালিকা তুলে ধরা হলেও জানানো হয়নি তালিকাটি কোথা থেকে পাওয়া গেল। Continue Reading →

অত্যাচারী বাপ-বেটার দর্প চূর্ণ একই কারাগারে

আজাদুর রহমান চন্দন

ফ. কা. চৌধুরী নামে পরিচিত চট্টগ্রামের ফজলুল কাদের চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান মুসলিম লীগের (কনভেনশন) সভাপতি। ষাটের দশকে পাকিস্তানের মন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের Dainik Pakistan 21-4-1971স্পিকারও হন ফ.কা.। সারা পাকিস্তানেই তিনি ছিলেন প্রচণ্ড প্রতাপশালী। ফ.কা. চৌধুরী এতটাই প্রভাবশালী ও দাম্ভিক ছিলেন যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করার পর মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, পিডিপিসহ দালাল দলগুলোর অন্য নেতারা দল বেঁধে গভর্নর টিক্কা খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও ফ.কা. তার সঙ্গে দেখা করেছেন শুধু নিজ দলের জেনারেল সেক্রেটারি মালিক মোহাম্মদ কাসিমকে নিয়ে। মুক্তিযুদ্ধকালে শান্তি কমিটিরও আলাদা একটি ধারা ছিল ফ.কা.র নেতৃত্বে। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওপর তার প্রভাব ছিল যেমন অসীম, তেমনি চট্টগ্রামে মুক্তিকামী মানুষ, বিশেষ করে সংখ্যালঘুদের ওপর তার নির্যাতনও ছিল অসহনীয়। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের পর থেকে আত্মসমর্পণের কয়েক দিন আগ পর্যন্ত তার বাসায় সব সময় মোতায়েন থাকত পাকিস্তান বাহিনীর এক প্লাটুন সৈন্য। ফ.কা.র অনুচরেরা চট্টগ্রামের বিভিন্ন জায়গা থেকে ধরে আনত নিরপরাধ লোকজন আর ছাত্রদের। এরপর এদের হাত-পা বেঁধে গিরায় গিরায় লোহার ডাণ্ডা দিয়ে পেটানো হতো। তার বাসায় নির্মম অত্যাচারের এতসব কায়দা ও ব্যবস্থা ছিল যে নীরোর যুগে জন্মালে তিনি নিশ্চয়ই প্রভোস্ট মার্শালের পদ পেতেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি দৈনিক বাংলায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘ফজলুল কাদের চৌধুরী ২৫ শে মার্চের পর থেকে চাটগাঁয় অত্যাচারের যে স্টিমরোলার চালিয়েছিলেন, আইকম্যান বেঁচে থাকলে এই অত্যাচার দেখে তাঁকে নিশ্চয়ই স্যালুট দিতেন।’ সংগত কারণেই হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর পর দেশ ছেড়ে পালাতে চেয়েছিলেন স্বাধীনতাবিরোধী এই জুলুমবাজ। Continue Reading →

ফাঁসিতে ঝুলতেই হলো ঘাতক সাকা চৌধুরী ও মুজাহিদকে

আজাদুর রহমান চন্দন

মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি অবশেষে কার্যকর করা হয়েছে। আদালতের রায় SaKa cartoon copyঅনুযায়ী আজ শনিবার রাত ১২টা ৫৫ মিনিটে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে শীর্ষস্থানীয় এই দুই অপরাধীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় বলে আইজি প্রিজন্স জানান। এর মধ্য দিয়ে দেশে প্রথম কোনো মন্ত্রীর ফাঁসি কার্যকর হলো। দুই অপরাধীই ভিন্ন ভিন্ন সরকারের সময় মন্ত্রী ছিলেন। দুজনের মধ্যে একাত্তরের কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর প্রধান মুজাহিদের প্রাণদণ্ড দেওয়া হয় বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে। একাত্তরে বুদ্ধিজীবী হত্যার দায়ে এটিই প্রথম ফাঁসি। তবে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এ নিয়ে চারজনের ফাঁসি কার্যকর হলো। ফাঁসি কার্যকর শেষে র‌্যাব ও পুলিশ প্রহরায় সাকা চৌধুরীর লাশ চট্টগ্রামে এবং মুজাহিদের লাশ ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়া হয়।
বিচার নিয়ে বিভিন্ন সময়ে দম্ভোক্তি প্রকাশকারী দুই মানবতাবিরোধী অপরাধীর ফাঁসি কার্যকর করার আগে কারাগার এলাকায় জড়ো হন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা এবং গণজাগরণ মঞ্চের কয়েকজন কর্মী। তাঁরা সাকা ও মুজাহিদের ফাঁসি দ্রুত কার্যকর করার দাবিতে স্লোগানও দেন। Continue Reading →

খন্দকার মোশতাকের প্রেতাত্মারা ক্ষমতা ঘিরছে?

আজাদুর রহমান চন্দন

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কালরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার সময় বঙ্গবন্ধুর দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ছিলেন বেলজিয়ামে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়। সঙ্গে Mushtaqছিলেন শেখ হাসিনার স্বামী পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ আলী মিয়া। ঢাকার খবর জেনে সানাউল হক তখন শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানাকে তার বাসায় রাখতে চাননি। সে সময় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ছিলেন পশ্চিম জার্মানিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত। বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যাকে জার্মানিতে পাঠিয়ে দিতে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী সেদিন ফোন করেছিলেন সানাউল হককে। কিন্তু সেখান থেকে সানাউল হক তার গাড়িটি পর্যন্ত দেননি সীমান্তে তাদের দিয়ে আসার জন্য। পরে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী নিজেই সীমান্ত থেকে গাড়ি পাঠিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যাদের তার কাছে নিয়েছিলেন। Continue Reading →

কলঙ্ক মোচনের বিচারপথে এখনো কিছু কালো ছায়া

আজাদুর রহমান চন্দন

মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী জাতি একাত্তরের নরঘাতকদের বিচার দেখার প্রতীক্ষায় কাটিয়েছে চার দশকেরও বেশি সময়। নানা অনিশ্চয়তা, হতাশা আর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান শুরু হয়েছে। Logoসেই সঙ্গে শুরু হয়েছে জাতির কলঙ্ক মোচন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রথম ফাঁসি কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশের ৪৩তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে। সেদিন রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় কসাই কাদের নামে পরিচিত আলবদর কমান্ডার আবদুল কাদের মোল্লাকে। স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামীর এই নেতার ফাঁসি কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এর মাধ্যমে একাত্তরের নির্মমতার বিচারহীনতা থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে জাতি। অনেক দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, গাফিলতি, চক্রান্ত সত্ত্বেও চলমান রয়েছে সেই বিচারকাজ। এরইমধ্যে গত ১১ এপ্রিল ফাঁসিতে ঝুলিয়ে প্রাণদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘাতক আলবদর বাহিনীর বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রধান সংগঠক মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের, যিনি যুদ্ধের শেষ দিকে আলবদর হাইকান্ডেও ঠাঁই পেয়েছিলেন। কুখ্যাত সেই বদর বাহিনীর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদের প্রাণদণ্ড বহাল আছে আপিলের রায়ে। এখন পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের অপক্ষায়। এসবই জাতির জন্য সুখবর। তবে চার দশকের কলঙ্ক মোচনের এই বিচার চলাকালে সময়ে সময়ে জাতির কাঁধে ভর করেছে ভয় আর হতাশা। Continue Reading →

শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা বিফলে চূড়ান্ত বিচারেও

আজাদুর রহমান চন্দন

মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্টগ্রাম দূরের কথা, দেশেই ছিলেন না–এমন দাবি করে আসছিলেন মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দণ্ডিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, যিনি সাকা চৌধুরী নামেই বেশি পরিচিত। দাবি S Q copyপ্রমাণ করার হাজারো কসরত করেছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার চলাকালে এই আসামি নিজের পক্ষে কয়েকজন সাফাই সাক্ষী হাজির করেছেন, যাতে প্রমাণ করা যায় ১৯৭১ সালে তিনি তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে ছিলেন। সাকা চৌধুরীর পক্ষের আইনজীবীরা দাবিটিকে ‘প্লি অব অ্যালিবাই’ (অপরাধ সংঘটনের সময় আসামির অপরাধস্থলে উপস্থিত না থাকার দাবি) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেন। ফৌজদারি অপরাধের যেকোনো মামলায় প্লি অব অ্যালিবাই প্রমাণিত হলে আসামিকে দোষী প্রমাণ করার আর কোনো সুযোগ থাকে না। এ বিবেচনায়ই হয়তো আসামিপক্ষ ট্রাইব্যুনালে তো বটেই এমনকি আপিল বিভাগেও এ বিষয়ের ওপর জোর দেয় সবচেয়ে বেশি। Continue Reading →

বুদ্ধিজীবীঘাতকের ফাঁসি বহাল : কলঙ্ক মোচনের পথে আরেক ধাপ

আজাদুর রহমান চন্দন 

বুদ্ধিজীবীদের ঘাতক ও মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের জন্ম ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার পশ্চিম খাবাশপুর গ্রামে ১৯৪৮ সালের ২ জানুয়ারি। তার বাবা আব্দুল আলী images(মৃত) মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন শান্তি কমিটির সদস্য। মুজাহিদ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে প্রথমে ময়েজুদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ে এবং পরে ফরিদপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। বাবার পথ অনুসরণ করে অষ্টম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় মুজাহিদ যোগ দেন জামায়াতের তখনকার ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘে। ১৯৬৪ সালে ফরিদপুর জিলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন ফরিদপুর সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে। রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের ফরিদপুর জেলা শাখার সভাপতি হন। ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তিনি ওই দায়িত্বে ছিলেন। এরপর তিনি ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৭১ সালের শুরুর দিকে তিনি ঢাকা জেলা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি হন। পরে মুক্তিযুদ্ধ চলা অবস্থায় ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে মুজাহিদ পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পান। তখন সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন মতিউর রহমান নিজামী। মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজামী ও মুজাহিদের নির্দেশে ও তত্ত্বাবধানে ইসলামী ছাত্রসংঘের সদস্যদের নিয়ে গঠন করা হয়েছিল কুখ্যাত আলবদর বাহিনী। Continue Reading →

রিভিউয়ের নামে অনুকম্পা চেয়েছিলেন তারা

আজাদুর রহমান চন্দন 
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) করার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। imageমুক্তিযুদ্ধকালে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ডাদেশপ্রাপ্ত কামারুজ্জামানের পুনর্বিবেচনার আবেদনের ওপর শুনানি শেষ হয় গতকাল ৫ এপ্রিল রবিবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগের চার সদস্যের বেঞ্চে। আজ সোমবার সকালে আপিল বিভাগ পুনর্বিবেচনার আবেদনটি খারিজ করে দিয়েছেন। কি কারণে আবেদনটি খারিজ করা হলো তা জানা যায়নি। সকাল ৯টা পাঁচ মিনিটে এজলাসে বসেন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ আপিল বিভাগের চার বিচারপতি। এক মিনিটের কম সময়ের ব্যবধানে আদেশ দেওয়া হয়। প্রধান বিচারপতি আদেশে বলেন, ‘পিটিশন ডিসমিসড’ (আবেদন খারিজ)। সংক্ষিপ্ত এই আদেশে কোনো ব্যাখ্যা না থাকলেও আগের দিনের শুনানি থেকেই বোঝা যায় কামারুজ্জামানের আইনজীবীরা রিভিউ আবেদনের নামে মূলত অনুকম্পা চেয়েছিলেন যাতে আসামির সর্বোচ্চ সাজা কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। Continue Reading →

Next Page