জয় করে তবু যায় না ভয়
আজাদুর রহমান চন্দন

জাতির ‘দুর্দিনে যারা শত্রুদের হাতে হাত রেখে খেলেছে করোটি নিয়ে ভুতুড়ে জ্যোৎস্নায়’ সেই নরঘাতকদের বিচার দেখার প্রতীক্ষায় পেরিয়ে গেছে চার দশকেরও বেশি সময়। নানা imageঅনিশ্চয়তা, হতাশা আর দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের পর অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান শুরু হয়েছে। সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে জাতির কলঙ্ক মোচন। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রথম ফাঁসির রায় কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশের ৪৩তম বিজয় দিবসের প্রাক্কালে গত বছর ১২ ডিসেম্বর রাতে। সেদিন রাত ১০টা ১ মিনিটে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ফাঁসির দড়িতে ঝোলানো হয়েছে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর নৃশংসতার জন্য রাজধানীর মিরপুর এলাকায় কসাই কাদের নামে পরিচিত এই আলবদর কমান্ডারের ফাঁসি কার্যকর করার মধ্য দিয়ে জাতির ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এর মাধ্যমে একাত্তরের নির্মমতার বিচারহীনতা থেকে মুক্তি পেতে শুরু করে জাতি। অনেক দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা, গাফিলতি, চক্রান্ত সত্ত্বেও চলমান রয়েছে সেই বিচারকাজ। তবে চার দশকের কলঙ্ক মোচনের এই বিচার চলাকালেও সময়ে সময়ে জাতির কাঁধে ভর করেছে ভয় আর হতাশা।

কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় গত বছর ৪৩তম বিজয় দিবসে দেশবাসী যতটা না উল্লসিত ও উজ্জীবিত ছিল, এবার ৪৪তম বিজয় দিবসে ততটা নয় বলেই দৃশ্যমান হয়েছে। জনমনে সবচেয়ে বেশি সংশয় এখন অপরাধী সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচার নিয়ে। আইনের অস্পষ্টতা দূর করার নামে এ ক্ষেত্রে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে বলে কোনো কোনো মহলের অভিযোগ। আবার কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবিতে জন্ম নেওয়া যে গণজাগরণ মঞ্চে গর্জে ওঠে ‘আরেক একাত্তর’, সেই মঞ্চে ভাঙন ধরানোটাও অশুভ লক্ষণ বলে মনে হচ্ছে অনেকের কাছে। এ ছাড়া শাসক দলের কোনো ত্রুটি কিংবা শাসনব্যবস্থার কোনো গলদের ফাঁক গলে আবার স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি বলীয়ান হয়ে ওঠে কি না, সেই সংশয়ও আছে।

২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী ওয়াদা অনুযায়ী গঠন করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িতদের বিচার কার্যক্রম। এর আগে ২০০৯ সালের ৯ এপ্রিল দুই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যৌথ বৈঠকে এ বিচারের জন্য তদন্ত কর্মকর্তা ও কেঁৗসুলি নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। যে আইনের বলে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের লক্ষ্যে তদন্ত কর্মকর্তা ও কেঁৗসুলি নিয়োগ এবং ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়, সেই আইন প্রণীত হয়েছিল ১৯৭৩ সালেই। তবে সে সময়ে এ আইন প্রয়োগ করা হয়নি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যদিও দালাল আইনে কিছু লোকের বিচার হয়েছিল এবং আরো অনেকের বিচার চলছিল; কিন্তু পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর ওই আইন বাতিল করে সাজাপ্রাপ্ত ও কারাবন্দি দালালদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছিল পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট। এর কয়েক দিন পরই কারাগারের ভেতরে হত্যা করা হয় জাতীয় চার নেতাকেও। ৩০ লাখ শহীদ আর চার লাখের বেশি মা-বোনের লাঞ্ছনার বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন স্বদেশ উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করেছিল মাত্র সাড়ে তিন বছরের মাথায় এসব হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগ এরপর দীর্ঘ ২১ বছর ছিল ক্ষমতার বাইরে।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় ফিরলেও সেই মেয়াদে একাত্তরের ঘাতকদের বিচারের উদ্যোগই নেয়নি। বরং ছিয়ানব্বইয়ের নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার দাবিতে আওয়ামী লীগ ও স্বাধীনতাবিরোধী দল জামায়াতের যুগপৎ আন্দোলন অনেক সমালোচনার জন্ম দেয়। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেই হতাশ হয়। কিন্তু ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত জোটের বিজয় এবং একত্রে সরকার গঠনের পর আবার অন্ধকারের দিকে পথচলা শুরু হয়। নির্বাচনের পরপরই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর ব্যাপক হামলা-নির্যাতন-ধর্ষণ। মন্ত্রিত্বের সুবাদে গাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগিয়ে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন আলবদরপ্রধান মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদকে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এক রায়েও ওই ঘটনাকে জাতির জন্য লজ্জাজনক বলে মন্তব্য করা হয়েছে। নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণে বলেন, স্বাধীনতাবিরোধী ব্যক্তিকে স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রী করা ছিল একটি বড় ভুল। এটি মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ ও সম্ভ্রম হারানো দুই লাখ মা-বোনের গালে কষে চড় দেওয়ার শামিল।

আলবদরের দুই হোতাকে মন্ত্রী বানানো ছাড়াও বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে আলোচিত হাওয়া ভবন ও সরকারি কোনো কোনো মহলের পৃষ্ঠপোষকতায় উত্থান ঘটেছিল বাংলা ভাই নামের এক ভয়ংকর জঙ্গি দানবের। তার নেতৃত্বাধীন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) উত্তরাঞ্চলে ত্রাস সৃষ্টি করা ছাড়াও দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে বোমা হামলা চালিয়েছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তখনকার বিরোধীদলীয় নেতা (বর্তমান প্রধানমন্ত্রী) শেখ হাসিনার জনসভায় ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা চালানো হয়, যাতে প্রাণ হারান আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। আহত হন শেখ হাসিনা নিজেও। ন্যক্কারজনক ওই ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে আছেন বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান, তখনকার স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও বিএনপি নেতা লুৎফুজ্জামান বাবর, তখনকার উপমন্ত্রী আবদুস সালাম পিন্টু, হুজি নেতা মুফতি হান্নান প্রমুখ। সব মিলিয়ে ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াতের শাসন দেশের মানুষকে চরমভাবে হতাশ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে। অন্যদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘যুদ্ধাপরাধীদের’ বিচারের অঙ্গীকারসহ দিনবদলের সনদ ঘোষণা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে। ফলে ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বিজয়ী হয়।

নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী মহাজোট সরকার ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে পরিচিত মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বিচারের উদ্যোগ নেওয়ায় চার দশক পর জাতি নতুনভাবে উজ্জীবিত হয়। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর প্রথম ৯ মাসে একটি অভিযোগও গঠিত না হওয়ায় জনমনে সংশয় দানা বাঁধে। ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রায় চার মাস পর ২০১০ সালের ১৫ জুলাই এর কার্যপ্রণালি বিধি প্রকাশ করা হয় প্রজ্ঞাপন আকারে। এ কার্যপ্রণালি বিধি না থাকায় ট্রাইব্যুনাল-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন তাঁদের কর্মপরিধি ও পদ্ধতি নিয়ে ছিলেন অন্ধকারে। ফলে কার্যক্রম চলে এলোমেলোভাবে। আবার দেরিতে কার্যবিধি তৈরি হলেও অনেক বিষয় তাতেও অস্পষ্ট থেকে যায়। অবশেষে সেই বছরের ২৮ অক্টোবর সংশোধিত কার্যবিধি গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। শুরুতেই সবচেয়ে বেশি সংশয় দেখা দেয় তদন্ত সংস্থার ‘প্রধান’ হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে নিয়ে। তাঁকে সরাতেও লেগে যায় অনেকখানি সময়।

নানা ত্রুটি-দুর্বলতা, কালক্ষেপণ সত্ত্বেও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে এরই মধ্যে ১৪ জনের সাজা হয়েছে। তাঁদের একজনকে যাবজ্জীবন, একজনকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড, একজনকে আমৃত্যু কারাদণ্ড এবং ১১ জনকে ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দুটি ট্রাইব্যুনাল। সাজাপ্রাপ্ত এই ১৪ জন হলেন জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, কেন্দ্রীয় নেতা মীর কাসেম আলী, দলের সাবেক রুকন (সদস্য) আবুল কালাম আযাদ, জামায়াতের মুক্তিযুদ্ধকালীন ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের কেন্দ্রীয় নেতা চৌধুরী মঈনুদ্দীন (বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের তিনি ছিলেন অপারেশন ইনচার্জ) ও আশরাফুজ্জামান খান (বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের চিফ একজিকিউশনার বা প্রধান জল্লাদ), বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, দলের সাবেক নেতা ও জিয়াউর রহমানের সময়কার মন্ত্রী আবদুল আলীম, ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা পৌরসভার মেয়র ও বিএনপি নেতা জাহিদ হোসেন খোকন এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মোবারক হোসেন। এই ১৪ জনের মধ্যে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডপ্রাপ্ত একজনের সাজা বাড়িয়ে ফাঁসির দণ্ড দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। আবার আরেকজনকে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে। সাজাপ্রাপ্ত চারজন পলাতক আছেন। সাজা ভোগ করা অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে দুজনের।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে প্রথম রায়টি হয়েছিল গত বছর ২১ জানুয়ারি পলাতক আবুল কালাম আযাদের বিরুদ্ধে মামলায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। এ ঘটনায় জাতি আবার নতুন করে আশায় বুক বাঁধে। কিন্তু এর দুই সপ্তাহের ব্যবধানে একই ট্রাইব্যুনালের আরেকটি রায় ঘিরে সবচেয়ে বেশি হতাশা ও ক্ষোভ দেখা দেয় দেশবাসীর মনে। কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল গত বছরের ৫ ফেব্রুয়ারি। রায় শোনার জন্য সেদিন ট্রাইব্যুনালের সামনে ভিড় জমিয়েছিল নানা স্তরের মানুষ। কিন্তু রায় ঘোষণার পর ট্রাইব্যুনালে উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাৎক্ষণিকভাবেই হতাশা ব্যক্ত করেন। মর্মস্পর্শী সব হতাশাধ্বনির পাশাপাশি সারা দেশে সর্বস্তরের মানুষের কণ্ঠেও উচ্চারিত হয়, ‘এ রায় মানি না।’ ক্ষোভে-দুঃখে মানুষ নেমে আসে রাজপথে। সবার কণ্ঠে একই দাবি, ‘কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই।’ একপর্যায়ে শাহবাগে গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। এর পর থেকেই গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীরা হয়ে আছে অতন্দ্র প্রহরীর মতো।

অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কাদের মোল্লার সাজা বাড়িয়ে ফাঁসির আদেশ দেন ২০১৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংক্ষিপ্ত এক রায়ে।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষ শুরু থেকেই সোচ্চার ছিল যাতে এ বিচারপ্রক্রিয়ায় সরকারের দিক থেকে কোনো গাফিলতি না করা হয়। কোনো রকম ত্রুটি-দুর্বলতা বা রাজনৈতিক লাভ-লোকসানজনিত হিসাবের মারপ্যাঁচে যাতে বিচারপ্রক্রিয়াটি হোঁচট না খায় বা ব্যর্থ না হয় সে জন্য সারাক্ষণ সতর্ক নজর রেখেছে তারা। অনেকে যেচে তথ্য-উপাত্ত ও দলিলপত্র দিয়ে সহায়তা করেছে তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশনকে। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এসব সহায়তা সব সময় সঠিকভাবে কাজে লাগাননি রাষ্ট্রপক্ষের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একটি মানসম্পন্ন দক্ষ প্রসিকিউশন টিম গড়া এবং ওই টিম ও তদন্ত সংস্থাকে সহায়তার জন্য একটি গবেষণা সেল গঠনের তাগিদ ছিল শুরু থেকেই। কিন্তু এ রকম অনেক তাগিদ ও পরামর্শ আমলে নেয়নি সরকার।

অন্যদিকে একাত্তরের চিহ্নিত অপরাধী ও তাদের মিত্ররা শুরু থেকে চেষ্টা করে আসছে বিচার বানচাল করার জন্য। তারা দেশে-বিদেশে ব্যাপক অপপ্রচার চালিয়েছে। এ জন্য শত শত কোটি টাকা দিয়ে বিদেশে লবিস্ট নিয়োগ করেছে। চক্রান্তের জাল বুনেছে ভেতরে বাইরে। ট্রাইব্যুনাল ও বিচারপ্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে রায়ের খসড়া ফাঁস করার ঘটনাও ঘটিয়েছে তারা। এসব করেও বিচার ঠেকানো যাবে না দেখে একপর্যায়ে তারা বেছে নেয় নাশকতা ও সহিংসতার পথ। গুজব রটিয়ে সাধারণ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে তাদেরও সহিংস কর্মকাণ্ডে নামিয়েছে স্বাধীনতাবিরোধী ওই ধর্মব্যবসায়ীরা। কিন্তু কোনো কিছুতেই শেষরক্ষা হয়নি তাদের।

তবে রায় কার্যকর করার ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগ এখনো আছে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহযোগী বাহিনী গড়ার হোতা এবং গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের নকশাকার গোলাম আযমের বিরুদ্ধে সব অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে তাঁকে ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়ায় অনেকেই সমালোচনামুখর হয়। এমন অপরাধীকে অনুকম্পা দেখানোর যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। আপিলের রায়ে সাঈদীর সাজা কমে যাওয়ার ঘটনায়ও হতাশা ব্যক্ত করেছে অনেকে।

সবারই জানা, একাত্তরের ঘাতকদের মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে অবস্থান রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মহলের। কাদের মোল্লার ফাঁসি কার্যকর না করার জন্যও যুক্তরাষ্ট্র চাপ দিয়েছিল, যদিও পরে দেশটি তার অবস্থান কিছুটা বদল করেছে। এখন ব্যক্তিবিশেষের বদলে জামায়াতকে বাঁচাতে তৎপর তারা। যুদ্ধাপরাধবিষয়ক মার্কিন দূত স্টিফেন জে র‌্যাপ গত আগস্টে তাঁর সর্বশেষ ঢাকা সফরকালে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশ্যেই বলে ফেলেন, ‘সামাজিক পুনর্মিলনের স্বার্থে’ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে কোনো সংগঠনের বিচার হওয়া উচিত নয়। বহির্বিশ্বের এ ধরনের অবস্থানের কারণেই সংগঠন হিসেবে জামায়াতের বিচারের লক্ষ্যে আইন সংশোধনে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে, নাকি অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কোনো সমীকরণ এতে কাজ করছে, সে নিয়েও আছে নানা সংশয়।

About

AZADUR RAHMAN CHANDAN E-mail : archandan64@gmail.com Date of Birth : November 27, 1964 Profession : Journalist (Working at The Daily Kaler Kantho) Academic Qualification : BScAg (Hons) from Bangladesh Agricultural University Institute : Patuakhali Agricultural College

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *