হাওরের কান্না থামবে কি শুধু বাঁধে!

আজাদুর রহমান চন্দন

দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলার বড় অংশই হাওর। আর ওসব হাওরে বছরে একটিই মাত্র ফসল হয়, বোরো ধান। কিন্তু গত দুই দশকে গড়ে প্রতি তিন বছরেও একবার পুরো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি 4হাওরের কৃষকরা। টানা কয়েক বছর ফসল মার যাওয়ার পর ২০০৮ সালে হাওরে বোরো ধান কৃষকের মুখে হাসি ফুটিয়েছিল। এর পরের ৯ বছরের মধ্যে মাত্র দুবার পুরো ফসল ঘরে তুলতে সক্ষম হন হাওরের কৃষক। অসময়ে কয়েকদিনের টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে এ বছর ধান গাছে থোর আসতে না আসতেই কোথাও বাঁধ ভেঙে, কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে তলিয়ে গেছে প্রায় সব হাওর। আগের বছর হাওরে বাঁধ ভেঙে কোথাও পাকা, কোথাও আধাপাকা বোরো ধান নষ্ট হয়েছিল চৈত্রের শেষ থেকে বৈশাখের শুরুতে। সে বছর ৪০ শতাংশের মতো ফসল তুলতে পেরেছিলেন হাওরের কৃষকরা। ২০১৫ সালে অকাল বন্যায় হাওরে ফসল নষ্ট হয়েছিল শতকরা ৪০ ভাগের মতো।
বেশ কয়েক বছর আগে বেসরকারি সংস্থা সিএনআরএসের এক সমীক্ষায় বলা হয়েছিল, ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত— পাঁচ বছরে শুধু সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যায় বোরো ফসলের ক্ষতি হয় ৫৮৭ কোটি ১২ লাখ ১৮ হাজার টাকার। অন্যান্য সূত্রের হিসাবে অবশ্য ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। ২০০৪ সালের মে মাসে অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের সহায়তায় রাজধানীতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘হাওরবাসী রক্ষায় নাগরিক উদ্যোগ’-এর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, ওই বছর এপ্রিলে পাহাড়ি ঢলে বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জে বোরো ফসলের ক্ষতি হয়েছিল ৪৫০ কোটি টাকার।
পাহাড়ি ঢলে প্রায় বছরই বোরো ফসলের এ রকম ক্ষতি হয়ে থাকে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার হাওরাঞ্চলেও।
সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া–এ সাত জেলার ৪৮টি উপজেলার ২০ হাজার ২২ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যে দুই হাজার ৪১৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে 1হাওর অঞ্চল। বছরের অর্ধেক সময় হাওরগুলো বহমান পানিতে ডুবে থাকায় জমিতে পলি জমে তা হয়ে ওঠে উর্বর। শুকনো মৌসুমে সেচসুবিধা নিশ্চিত করাসহ পরিকল্পিত উপায়ে চাষ করতে পারলে আর চৈত্র-বৈশাখে আগাম বন্যার হাত থেকে রা করা গেলে এ অঞ্চল থেকে শুধু বোরো থেকেই যে পরিমাণ চাল উৎপাদন করা সম্ভব, তা দিয়ে গোটা দেশের খাদ্য চাহিদার সিংহভাগ পূরণ করা যেতে পারে। ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকে হাওর এলাকার সংসদ সদস্যদের সঙ্গে এক বৈঠকে বলা হয়েছিল, দেশের ৪১১টি হাওরের মধ্যে ৪৬টি থেকেই বছরে ৭০০ কোটি টাকার ফসল উৎপাদন সম্ভব। আর সবকটি হাওরকে উন্নয়নের আওতায় আনা গেলে শুধু হাওরাঞ্চল থেকে উৎপাদিত ফসল দিয়েই সারা দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে চাল রপ্তানি করা যেতে পারে। (সূত্র : সংবাদ, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০০৭)।
যথাযথ পরিকল্পনা নিয়ে এগোলে পর্যটন এলাকা হিসেবেও এ অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে গুরুত্বপূর্ণ। এককালে এ অঞ্চলের হাওর ও নদী থেকে তোলা উৎকৃষ্ট মুক্তা রপ্তানি হতো সুদূর ইউরোপে। মৎস্যসম্পদেরও বিশাল আধার হাওর। হাওরের মিঠা পানির মাছের মতো এমন সুস্বাদু মাছ অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন। সুনামগঞ্জ জেলা মৎস্য অফিস সূত্রের বরাত দিয়ে ২০০২ সালের ২৮ অক্টোবর দৈনিক জনকণ্ঠের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ১৯৭০ সালের আগেই জেলায় মাছের বার্ষিক উৎপাদন ছিল গড়ে এক লাখ টনের বেশি। ১৯৭২-৭৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৯৫ হাজার টন। ১৯৯০-৯১ অর্থবছরে তা নেমে আসে ৪০ হাজার টনে। ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে তা আরো কমে ৩৫ হাজার টনে দাঁড়ায়। ওই প্রতিবেদনে জেলায় মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে যাওয়ার জন্য পলি জমে হাওর ও নদী ভরাট হওয়া এবং ইজারার শর্ত উপক্ষা করে বিল শুকিয়ে ইজারাদারদের মাছ ধরাকে দায়ী করা হয়।
এবার কয়েকদিনের ব্যবধানে শত শত হাওরের উঠতি বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার পর সেখানকার পানি দূষিত হয়ে মারা গেছে মাছ, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী। হাওরে মাছ মরে ভেসে ওঠার ছবি কয়েকদিন ধরে ছাপা হয়েছে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে, প্রচারিত হয়েছে বিভিন্ন ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায়।
এ বছর হাওর এলাকায় নদীতে পানির চাপ প্রথম দফায় বাড়ে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে। যদিও সেই পানির চাপ হাওরের বাঁধ ভাঙার মতো ছিল না, তবু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলতিতে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল প্রকল্পের ফসলরক্ষা বাঁধের একটি ভাঙা অংশ সময়মতো মেরামত না করায় ওই প্রকল্পের আওতাধীন ১০টির মতো হাওরের উঠতি বোরো ধান তলিয়ে যায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ১২ ফাল্গুন থেকে পরবর্তী কয়েকদিনে। এরপর ২৯ মার্চ থেকে সিলেট অঞ্চলে শুরু হয় টানা বর্ষণ। ওই সময় উজানে ভারতের চেরাপুঞ্জিতে প্রায় ১১০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। প্রবল বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যায় হাওর এলাকার নদ-নদীর। ওই পানির চাপে কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে ৪ এপ্রিল থেকে ফসল তলিয়ে যেতে থাকে একের পর এক হাওরের।
এ বছর হাওর এলাকায় নদীতে পানির চাপ প্রথম দফায় বাড়ে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে। যদিও সেই পানির চাপ হাওরের বাঁধ ভাঙার মতো ছিল না, তবু পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) গাফিলতিতে সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা উপজেলার চন্দ্র সোনারথাল প্রকল্পের ফসলরক্ষা বাঁধের একটি ভাঙা অংশ সময়মতো মেরামত না করায় ওই প্রকল্পের আওতাধীন ১০টির মতো হাওরের উঠতি বোরো ধান তলিয়ে যায় গত ২৪ ফেব্রুয়ারি অর্থাৎ ১২ ফাল্গুন থেকে পরবর্তী কয়েক দিনে। এরপর ২৯ মার্চ থেকে সিলেট অঞ্চলে শুরু হয় টানা বর্ষণ। প্রবল বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে অস্বাভাবিকভাবে পানি বেড়ে যায় হাওর এলাকার নদনদীর। ওই পানির চাপে কোথাও বাঁধ ভেঙে আবার কোথাও বাঁধ উপচে পানি ঢুকে গত ৪ এপ্রিল থেকে ফসল তলিয়ে যেতে থাকে একের পর এক হাওরের। যথারীতি এবারও বাঁধ নির্মাণ বা মেরামতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সোচ্চার হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ছাড়াও খোদ রাজধানীর বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তি ও সংগঠন। এরইমধ্যে সুনামগঞ্জে বাঁধ নির্মাণে দুর্নীতি নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ আমলে নিয়ে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশনও (দুদক)। বাঁধ নির্মাণ বা মেরামতে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ মোটেই অমূলক বা অসত্য নয়। তবে এ নিয়ে হৈচৈয়ের ডামাডোলে বরাবরের মতোই আড়ালে থেকে যাচ্ছে আরেকটি বড় সত্যি। সেটি হলো–যে নদনদী দিয়ে উজান থেকে নেমে আসে পাহাড়ি ঢল, সেই নদনদীর করুণ মৃত্যু।
২০১০ সালে এপ্রিলের শুরুতেই অর্থাৎ মধ্য চৈত্রে হাওরে বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়েছিল। সে বছর ১১ মে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত এক নিবন্ধে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ উপজেলার তখনকার ভাইস চেয়ারম্যান শামিমা শাহরিয়ার লিখেছিলেন, ‘‌’প্রথম যখন পাহাড়ি ঢল নেমে কিছু কিছু হাওরের বাঁধ ভেঙে যায়, তখন অন্য সবার মতো আমরাও পাউবোর কর্মকর্তার দুর্নীতিকেই বড় করে দেখেছিলাম। কারণ প্রতিবছর একই বাঁধ বারবার বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে এনে হাওরবাসীর সঙ্গে পাউবো চোর-পুলিশ খেলা করে। যেমন–যদি বন্যা হয়, তাহলে কেউ খবর রাখে না কোন কোন প্রকল্পে কাজ হলো কি হলো না। জনগণের অভিমত হলো, অবশ্যই দুর্নীতি হয়েছে বাঁধ নির্মাণে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত অভিমত হলো, শতভাগ কাজ হলেও এ বছর বাঁধ উপচে পানি আসতই। কারণ হাওরপাড়ের সব নদী নাব্যতা হারিয়েছে।’’
সেবার পাহাড়ি ঢল নেমেছিল এপ্রিলের শুরুতে, আর এবার নেমেছে মার্চে। এ ছাড়া এ বছর হাওরাঞ্চলের নদনদীতে পানির যে উচ্চতা ও তোর দেখা গেছে তেমনটি গত ৪০ বছরেও দেখেনি কেউ। তাই এ কথা বললে অত্যুক্তি হবে না যে, বাঁধের কাজ নিয়মমাফিক শেষ হলেও এবার বাঁধ ভেঙে বা উপচে হাওর ডুবতই। সেই সঙ্গে ডুবত লাখ লাখ কৃষকের স্বপ্নের বোরো ফসল। তবে এটাও মনে করার কারণ নেই যে, বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারকাজে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতি হয়নি।
ধান, মাছ, পাখি ও পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনাময় হাওর অঞ্চলের দিকে এতকাল সামান্যই নজর পড়েছে জাতীয় নীতিনির্ধারকদের। নজর যেটুকু পড়েছে তা শুধু হাওরে বেড়িবাঁধ ও ডুবো সড়ক নির্মাণের দিকেই। 2প্রতিবছর কয়েক শ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয় হাওরে বাঁধ নির্মাণ বা সংস্কারের জন্য; কিন্তু তাতে কাজের কাজ তেমন হয় না।
আসলে পাহাড়ি ঢল বা আগাম বন্যার হাত থেকে হাওরের ফসল রক্ষার কৌশলটি আমাদের জাতীয় উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে পুরোপুরি সম্পর্কিত। গত কয়েক দশকে সব সরকারই মূলত আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোর পরামর্শে রেল ও নৌপথকে উপেক্ষা করে সড়ক যোগাযোগের দিকে যেমন মনোযোগ দিয়েছে, তেমনি বন্যা মোকাবেলায়ও গুরুত্ব দিয়েছে বাঁধ নির্মাণ তথা ‘‘ঘেরাও’’ পদ্ধতিকে। সামান্য বৃষ্টিপাতে জলাবদ্ধতা ও বন্যা এবং পাহাড়ি ঢলে হাওরের ফসলহানি রোধ করতে না পারাটা ‘’ঘেরাও’ দৃষ্টিভঙ্গি’র ব্যর্থতারই পরিণাম। এ অবস্থায় আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গিটিও পর্যালোচনার দাবি রাখে।
দেশের নদনদী ও জলাশয় ব্যাপক হারে ভরাট হওয়া এবং শুকিয়ে যাওয়ায় ফসল ও মাছ উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সেই সঙ্গে হুমকির মুখে পড়ছে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য। কোনো গবেষণা ছাড়া সাদা চোখেই দেখা যায়, নদী শুকিয়ে গেলে অববাহিকা অঞ্চলের মাটিও শুকিয়ে যায়। আর নদী-নালা শুকিয়ে যাওয়ায় সেচের জন্য নির্ভর করতে হয় ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর। তাতে খরচও পড়ে বেশি। এ ছাড়া ক্রমাগতভাবে ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহারের ফলে নতুন বিপর্যয় নেমে আসে পরিবেশের ওপর। কাজেই আমাদের কৃষি অর্থনীতি ও পরিবেশ রক্ষার জন্য নদনদী রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। বিশেষ করে নদীগুলোর উজানের দিকে পানির প্রবাহ বাড়াতে হবে।
একটা সময় পর্যন্ত নদী খননের কথা উঠলেই জাতীয় নীতিনির্ধারকরা ব্যয়বহুল আখ্যা দিয়ে প্রসঙ্গটি এড়িয়ে যেতেন। অথচ এটা না করায় খননজনিত খরচের চেয়ে কত বেশি লোকসান বা তি হচ্ছে সে হিসাব খতিয়ে দেখা হয়নি। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফসহ আন্তর্জাতিক ঋণদানকারী সংস্থাগুলোও নদী খননের মতো প্রকল্প হাতে নিতে নিরুৎসাহিত করত। শুধু তাই নয়, গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকে দেশে দেশে বাঁধ নির্মাণের হিড়িক পড়েছিল বিশ্বব্যাংকেরই প্রেসক্রিপশনে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ কিংবা সস্তায় জলবিদ্যুৎ পাওয়ার আশায় দেশে দেশে এতকাল বাঁধ নির্মাণের প্রতিযোগিতা চলেছে রীতিমতো। আর এ অশুভ প্রতিযোগিতায় অঢেল অর্থ ও ইন্ধন দিয়েছে বিশ্বব্যাংসহ আন্তর্জাতিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বাঁধ নির্মাণ করে পানির অস্বাভাবিক প্রবাহ আটকে দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়ে মানুষ একধরনের আত্মতৃপ্তিও পেয়ে এসেছে এত দিন। বিশাল আকৃতির বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি বড় দেশগুলোর কাছে এমনকি মর্যাদার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। কিন্তু যেসব বাঁধকে একসময় আশীর্বাদ মনে করা হতো, সেগুলোই এক পর্যায়ে মানুষের কাছে অভিশাপ হয়ে দেখা দেয়। ফলে দেশে দেশে জোরদার হয়ে উঠে বাঁধবিরোধী আন্দোলন। এমনকি খোদ বিশ্বব্যাংকও স্বীকার করেছে যে, পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে বাঁধ নির্মাণের ওপর বেশি জোর দেওয়ার নীতি ছিল ভুল। প্রকৃতিবিরোধী ওই কাজের মাধ্যমে বিশ্বের বারোটা বাজিয়ে অবশেষে বিশ্বব্যাংকের ১৯৯৯-২০০০ সালের বার্ষিক উন্নয়ন প্রতিবেদনে বলা হয়, যেখানে সেখানে বাঁধ নির্মাণের দরুন অর্থনৈতিক ক্ষতি, স্থানীয় লোকজনকে অন্য জায়গায় স্থানান্তরের ফলে সামাজিক ক্ষতি এবং অন্যান্য সামাজিক ও পরিবেশগত সমস্যা সৃষ্টি হয়।
বাঁধ নির্মাণের উৎসাহে ভাটা পড়লেও নদী খননের মতো কাজে এখনো তেমন উৎসাহ দেখায় না আন্তর্জাতিক অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। তবে দিন বদলেছে। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দেশের উপকূলবাসীকে রক্ষা করতে এখন নদী খননের নানা প্রকল্প হাতে নিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। বাইরে থেকেও এ খাতে অর্থ মিলছে। উপকূল অঞ্চলের পাশাপাশি এখন হাওরাঞ্চলেও যে নদী খননের ব্যাপক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি  সে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে হবে নীতিনির্ধারকদের সামনে। তা না হলে বিপদ আরো বাড়বে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন পঞ্জিকার সময়ের আগেই বর্ষাকাল শুরু হয়ে যাচ্ছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বোরো ফসল কাটার মৌসুমে (এপ্রিল-জুন) ভারি বৃষ্টিতে হাওরগুলো আরো বেশি করে জলমগ্ন হয়ে পড়বে। সেই সঙ্গে আগাম বন্যা একটি নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়াবে। ফলে বোরো উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হবে ব্যাপকভাবে।
বেশ কয়েক বছর আগেই ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিংয়ের (আইডাবি­উএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৫০ সাল নাগাদ দেশের হাওরগুলোর পানির উচ্চতা প্রাকবর্ষা মৌসুমে দশমিক ৩ থেকে দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে সুনামগঞ্জের কর্চার হাওরের পানির উচ্চতা দশমিক ৩ মিটার ও সিলেটের জিলকর ও মৌলভীবাজারের কাওয়ারদীঘি হাওরের পানির উচ্চতা দশমিক ৬ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যাবে। তেমনটি হলে কৃষকরা সময়মতো চাষ শুরু করলেও ফসল তোলা খুব কঠিন হয়ে পড়বে।
বৈশাখে আগাম বন্যায় হাওরের ফসল তলিয়ে গেলেও ফাল্গুন-চৈত্র মাসে সেখানে সেচ দেওয়ার মতো পানি থাকে না নদ-নদীতে। অথচ কয়েক দশক আগেও ওই অঞ্চলের কোনো কোনো নদী দিয়ে সারা বছর বড় ডাবল ডেকার লঞ্চ, কার্গো, স্টিমার চলাচল করত। আর তখন হাওর রক্ষায় কোনো বেড়িবাঁধও ছিল না। হাওরের পানি নিষ্কাশনের খালগুলোতে শুধু পানি আসার আগে বাঁধ দেওয়া হতো। সেটাও দিতেন এলাকার কৃষকরা নিজ উদ্যোগেই। তাতেই রক্ষা পেত হাওরের ফসল। এমনকি কোনো কোনো বছর ফসল কাটার পর জমিতে থাকা গোড়া বা নাড়া থেকে নতুন করে কুশি গজাত এবং তা থেকে মিলত মুরি ফসল। এলাকার অসচ্ছল লোকজন সংগ্রহ করত সেই মুরি ফসল, যাকে নেত্রকোনা-সুনামগঞ্জের হাওরের মানুষ বলত ‘ডেমি’। অথচ এখন বাঁধ দিয়েও মূল ফসলই তোলা যাচ্ছে না।
জলবায়ু যেভাবে বদলে যাচ্ছে তাতে শুধু হাওরে বাঁধের উচ্চতা বাড়িয়ে যে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাবে না–সে সত্যটি দিন দিনই স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এ বছর হাওরে যে দুর্যোগ দেখা দিয়েছে তা মোকাবেলা করার 3জন্য আশু ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মসূচি যেমন হাতে নেওয়া দরকার তেমনি হাওরের কৃষকের কান্না স্থায়ীভাবে থামাতে হলে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও হাওরাঞ্চলের নদীগুলো খনন করতে হবে জরুরি ভিত্তিতে। বাঁধের ভেতরে থাকা মরা নদী, খাল-বিলও খনন করা দরকার। আশার কথা, রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সম্প্রতি আগাম বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে হাওরাঞ্চলের ফসল রক্ষায় সব নদী খনন ও প্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তবে সব কাজের জন্য সরকারের দিকে তাকিয়ে না থেকে কিছু উদ্যোগ নিতে হবে স্থানীয়ভাবেও। যেমন বাঁধের ভেতরের মরা নদী ও খাল-বিল খনন এবং বাঁধের দুই পাশে জলজ বৃক্ষ রোপণের মতো কাজগুলো স্থানীয় সরকার উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার সহায়তা নিয়ে এমনকি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতেও করতে পারে। সব কিছুর আগে দরকার ব্যাপক জনসচেতনতা ও গণজাগরণ। কারণ নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, ত্রাণ বিতরণ–সব ক্ষেত্রেই অনিয়ম-দুর্নীতির সুযোগ থেকেই যাবে; যতক্ষণ না স্থানীয় জনগণ বিশেষ করে তরুণসমাজ অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবে।

লেখক : সাংবাদিক, কৃষিবিদ

About

AZADUR RAHMAN CHANDAN E-mail : archandan64@gmail.com Date of Birth : November 27, 1964 Profession : Journalist (Working at The Daily Kaler Kantho) Academic Qualification : BScAg (Hons) from Bangladesh Agricultural University Institute : Patuakhali Agricultural College

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *